লেখা নাকি ধুঁকছে
'লেখা', এ এক বড় বিড়ম্বনার জিনিস। মানুষ শুনতে বা পড়তে যতো না ভালবাসে লিখতে তার চাইতে অনেক কম, হতে পারে হয়তো কেউ লিখতে না চাওয়ার অভিপ্রায়ে অথবা কেউ সঙ্গতভাবেই লিখতে পারে না বলে। জীবনের পরিসর ছোট হোক কি বড়, যে কোনো অবস্থাতেই যা কিছু গল্প সঞ্চয় হয় কিংবা যা কিছু সংগ্রহ করতে পারি আমরা তার সবকিছুই 'লেখা' হতে পারে।
বস্তুত,একদিন আমি বাস থেকে নেমে কন্ডাক্টর কে পাঁচ টাকা কম দিলাম,তার মধ্যেকার যে আনন্দ,নিজেকে উপযুক্ত ভাবতে পারার যে বিলাসিতা তা নিয়েও দিব্যি একখানা গায়েগতরে 'লেখা' হতে পারে আবার জেমস জয়েস সাহেব যে 'লেখা' লিখে গেছেন সে 'লেখা'তেও সমৃদ্ধতা থাকে। তফাৎ এখানে দু জায়গায়:প্রথমত,বাসের কন্ডাক্টর টাকা না নেওয়ায় তার কোনো কুণ্ঠা জাগেনি,সে বাস ছেড়ে চলে গেছে, একইভাবে এই গল্প শীতকালের কাথার মত আমাদের আনন্দ দিয়ে হেমন্তের প্রাক্কালে মিঠে রোদের নতুন কোনো বিচিত্র ঝলকের দিশা দেখিয়ে আমাদের মন থেকে বিদায় নেবে। আবার সেইখানেই জয়েস তার সাহসিকতায় ভর করে যে অপূর্ব,চিরন্তন মজার বীজ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তার চাওয়া পুরন তো হবে কিন্তু অংশত তা কার্যকর হবে না, পাশ্চাত্যের কঠোর, সাহসী পদক্ষেপে নিদারুন সত্য অনুধাবন করার বিপরীতে আমরা তা আধেক পড়ে আধেক বুঝে তার মজার জায়গা থেকে ভিন্ন হয়ে হোমিওপ্যাথির মোদক খেতে অগ্রসর হব। দ্বিতীয়ত,প্রথম গল্পের গা জোয়ারি চাহিদা এক দশকে বাড়তে বাড়তে এমন হবে যেখানে মড়ার আগে যমদূত এসে মাড়তে চাইলে তাকে এই গল্প শোনাবো, তাতে তিনি আরও রোষে পরে আমাদের মেরে ফেলবেন, অথচ দ্বিতীয় জয়েস সাহেবের যে গল্পখানি পেড়ে সেই যমদূতের ভাবাবেগের পরিবর্তন ঘটানো যেত,তা ঐকান্তিকভাবেই ভুলে যাব।
নীতি-বির্গহিত কাজ করে অনুধাবন করার চেষ্টা না করে আমরা নীতির অনুকূলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আনুকূল্য পেতে চেষ্টা করি, সম্ভবত 'লেখা'র কিছু প্যাঁচ-পয়জার তা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, তথাপি 'লেখা'র মধ্যে কিছু বিরামের প্রয়োজন হয়, তা তো দিইইই না, তার বদলে আমরা বিরামহীনভাবে অযথা ভাবানুরাগ গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকি।প্রশ্ন এই যে আমি এই গোটা 'লেখা'তেই এক বৈপ্যরীত্যের ইঙ্গিত টানার চেষ্টা করেছি,অথবা খুঁজেছি; সেটা কি?কি তার প্রয়োজন?সেইটা না বলে আর একটা অংশ বলি। তা হচ্ছে, 'লেখা'র একটা গুন আছে, তা তোমার স্পর্ধার যথাযথ যোগ অথবা বিয়োগ ঘটায়, শীতহীন গ্রীষ্মে একটা লেখা চারিদিকে ভেঁপু বাজিয়ে দিতেই পারে, তবে শীত যখন আবার আসবে তখন সেই 'লেখা'র প্রাসঙ্গিকতা বহমানথাকার দরকার বৈকি, বিশ্ব-চরাচরে সর্বোচ্চ নিস্পৃহতার জায়গা 'লেখা', আবার সর্বোত্তম সাধনাও সেই 'লেখা'।পালিত হবার আশায় সমর্পিত হতে চাওয়া, নাকি লালন করবার ভয়ে দূরে থাকা:'লেখা' এবং লিখতে চাওয়ার দীর্ঘ পাঁচহাজার বছরের এই ইতিহাস কোনদিকে যাবে,তা আমাদের প্রধান কর্ত্যব্য হিসাবে বিবেচিত হওয়ার দরকার আছে।
